গভীর পর্যবেক্ষণে হেফাজত, বহিষ্কার হতে পারেন মামুনুল হক!

রিসোর্ট কাণ্ডের পর হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশ-এর কেন্দ্রীয় কমিটির যুগ্ম মহাসচিব মাওলানা মামুনুল

হককে নিয়ে বিপাকে পড়েছেন দলটির নীতি-নির্ধারকরা। এ ঘটনার পর নিজেকে নির্দোষ প্রমাণে মামুনুল

 

হক যা করেছেন তাতে সাধারণ সমর্থকদের থেকে শুরু করে দলটির শীর্ষ নেতারা পর্যন্ত চরম বিরক্ত। যদিও

দলটির শীর্ষ নেতারা জনসম্মুখে তাঁদের বিরক্তি দেখাতে চাইছেন না। কিন্তু মামুনুল কাণ্ডে সাধারণ মানুষের

 

মাঝে সংগঠনটি সম্পর্কে যে নেতিবাচক ধারণা তৈরি হয়েছে তা ঘোচাতে মামুনুল হককে অব্যাহতি দেওয়া

ছাড়া অন্য কোনো উপায়ও দেখছে না দলের শীর্ষ নেতৃবৃন্দ। শুক্রবার (৯ এপ্রিল) হেফাজতে ইসলাম-এর

 

চট্টগ্রাম ও ঢাকার শীর্ষ পর্যায়ের একাধিক নেতার সংগে কথা বলে এসব তথ্য পাওয়া গেছে। এমন অবস্থায়

মান রক্ষায় আপাতত মামুনুল হক-কে অব্যাহতি দিতে চায় দলটি। তবে এক্ষেত্রে পরিস্থিতি-প্রভাব

 

বিবেচনায় নিয়ে ধীরে এগুতে চাচ্ছেন দলের নীতিনির্ধারকরা। এ নিয়ে দলের অভ্যন্তরে গভীর তদন্ত হচ্ছে

বলে জানা গেছে। আর এ তদন্ত দু’টি বিষয়কে সামনে নিয়ে এগুচ্ছে। প্রথমত, মামুনুল হক কাণ্ডে সাধারণ

মানুষের মাঝে কী ধরণের প্রভাব পড়েছে এবং সাধারণ মানুষ এখন হেফাজতকে কোন দৃষ্টিতে

 

দেখছেন; দ্বিতীয়ত, মামুনুল হকের দাবি করা দ্বিতীয় স্ত্রী’র বিষয়ে আরও গভীরভাবে অনুসন্ধান করে প্রকৃত

সত্য তুলে আনা। এ দু’টি বিষয় বিশ্লেষণ করেই মামুনুল হক-এর বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে চায় হেফাজত।

তদন্তে যদি নেতিবাচক প্রভাব পরিলক্ষিত হয় সেক্ষেত্রে মামুনুল হককে বহিষ্কারও করা হতে পারে।

 

নীতিনির্ধারকদের কেউ কেউ মনে করছেন, মামুনুল হক নিজেই হয়তো দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি নিবেন।

শীর্ষ নেতারা বলছেন, মামুনুল হক মানেই হেফাজতে ইসলাম নয়। আবার হেফাজতে ইসলাম মানেও

ব্যক্তি মামুনুল হক নন। তাই ব্যক্তি হিসেবে কেউ অপরাধ করলে তার দায় সংগঠন নিবে না। মামুনুল

 

হকের অপরাধও যদি প্রমাণিত হয় তবে সে দায় সংগঠন নিবে না। আর এজন্য হুট করে কোনো সিদ্ধান্ত

নিতে চাইছেন না তাঁরা। হেফাজত-এর নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক শীর্ষ নেতা বাংলাভিশন

ডিজিটালকে জানান, মামুনুল হক-র কারণে দলের ক্ষতি হোক এমনটা তাঁরা চাচ্ছেন না। আবার মামুনুল

 

হকও নির্দোষ হয়ে দোষী সাব্যস্ত হবেন, সেটাও তাঁরা চাচ্ছেন না। তাই এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে আরও

কিছুদিন সময় নেবেন নীতিনির্ধারকরা। হেফাজতে ইসলামের ঢাকা মহানগর শাখার সহ-সভাপতি

মাওলানা ফজলুল করিম কাসেমী মনে করেন, মামুনুল হক-এর যে বিষয়গুলো প্রকাশ্যে এসেছে এগুলো

 

তাঁর একান্তই ব্যক্তিগত। এর দায় দল নিবে না। তিনি বলেন, কেউ যদি ছোট-খাটো ভুল করে তার প্রভাব

কিন্তু ভালো হয় না। কারণ, ছোট-খোটো কোনো ভুলও ভালো বার্তা দেয় না। এটা অস্বীকার করার সুযোগ

নেই। আমির সাহেব চট্টগ্রামে থাকেন এবং মহাসচিব ঢাকায় থাকেন। তাঁদের সংগে শীর্ষ নেতারা নিয়মিত

 

যোগাযোগ করছেন বা উনারাও নেতাদের সংগে যোগাযোগ করছেন এ বিষয়ে। উনারা হুট করে কোনো

নেওয়াকে সমীচীন মনে করছেন না। তবে হেফাজতের শক্তিকে কেউ যাতে রাজনৈতিক বা ব্যক্তিগতভাবে

ব্যবহার করতে না পারে সে বিষয়ে খেয়াল রাখার জন্য নীতিনির্ধারকদের প্রতি আহ্বান জানান মাওলানা

 

ফজলুল করিম কাসেমী। গত ৩ এপ্রিল বিকেলে নারী সংগীসহ নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁওয়ের রয়্যল

রিসোর্ট-এ অবরুদ্ধ হন হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশ-এর যুগ্ম মহাসচিব মামুনুল হক। সেখানে স্থানীয়দের

তোপের মুখে ওই নারীকে তিনি দ্বিতীয় স্ত্রী হিসেবে পরিচয় দেন। ওই ঘটনার পর থেকে দেশজুড়ে তীব্র

 

সমালোচনা শুরু হয়। এতে চরম বিপাকে পড়ে তাঁর সংগঠনও। পরিস্থিতি সামাল দিতে ঘটনার একদিন

পর অর্থাৎ ৫ এপ্রিল মোহাম্মদপুরের জামিয়া রহমানিয়া মাদ্রাসায় জরুরি বৈঠকে বসেন হেফাজতের শীর্ষ

নেতারা। ওই বৈঠক উপস্থিত ছিলেন- হেফাজতে ইসলামের মহাসচিব মাওলানা নুরুল ইসলাম, উপদেষ্টা

 

মাওলানা আবুল কালাম, নায়েবে আমির মাওলানা আব্দুল আউয়াল, মাওলানা মাহফুজুল হক, অধ্যাপক

ড. আহমদ আব্দুল কাদের, মাওলানা আব্দুর রব ইউসুফী, যুগ্ম মহাসচিব মাওলানা জুনায়েদ আল হাবিব,

মাওলানা ফজলুল করিম কাসেমী, মাওলানা খালেদ সাইফুল্লাহ আইয়ুবী, সহকারী মহাসচিব মাওলানা

 

খুরশিদ আলম কাসেমী, মাওলানা মুজিবুর রহমান হামিদী, মাওলানা হাসান জামিল, মাওলানা

জসিমউদ্দীন, মাওলানা সাখাওয়াত হোসাইন রাজী, মাওলানা মুসা বিন ইজহার, অর্থ সম্পাদক মাওলানা

মুনির হোসাইন কাসেমী, ঢাকা মহানগর সহ-সভাপতি মাওলানা আহমদ আলী কাসেমী, কেন্দ্রীয় সহ-

 

সাংগঠনিক সম্পাদক মাওলানা আতাউল্লাহ আমিন, সহ-প্রচার সম্পাদক ফয়সাল আহমদ, সহ-অর্থ

সম্পাদক মাওলানা জাকির হোসাইন কাসেমী, সহকারী সমাজকল্যাণ সম্পাদক মাওলানা গাজী ইয়াকুব,

 

ঢাকা মহানগর সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক মাওলানা আজিজুর রহমান হেলাল, মাওলানা ফজলুর রহমান

প্রমুখ। বৈঠকে নিজেকে নির্দোষ প্রমাণে কয়েকজন অনুসারী নিয়ে অংশ নেন মাওলানা মামুনুল হক।

বৈঠক সূত্রে জানা গেছে, মামুনুল হক-এর কর্মকাণ্ডে অসন্তোষ প্রকাশ করেন উপস্থিত শীর্ষ নেতারা। তাঁরা

 

অভিযোগের সুরে বলেন, সস্তা জনপ্রিয়তা পেয়ে ধরাকে সরা জ্ঞান করছিলেন মামুনুল হক। আর একারণে

বাইরে চলে গিয়েছিলেন তিনি। এমনকি কাউকে তোয়াক্কা না করে মামুনুল হক নিজেকে সর্বেসর্বা মনে

করতেন। বৈঠকে নেতারা আরও অভিযোগ করেন, মামুনুল হক সংগঠনের চেইন অব কমান্ড মানছেন

 

না। অনেকটাই বেপরোয়া হয়ে উঠেছিলেন। তাঁর কারণে হেফাজতের প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থা এবং

বিশ্বাস উঠে যাচ্ছে। অনাহুত ঝামেলা পাকিয়ে সরকারকেও খেপিয়ে তুলছেন তিনি। তাই তাঁর বিষয়ে

সিদ্ধান্ত নেয়া উচিত। বৈঠক সূত্রে আরও জানা যায়, আলোচনার এক পর্যায়ে হেফাজতের নায়েবে আমির

 

মাওলানা আব্দুল আউয়াল ও মাওলানা আব্দুর রব ইউসুফী মামুনুল হক-এর কথিত দ্বিতীয় স্ত্রী জান্নাত আরা

ঝর্ণার পার্লারে কাজ করার বিষয়টি তুলে ধরেন এবং এ ব্যাপারে মামুনুল হক-এর কাছে প্রকৃত সত্য জানতে

চান। তখন মামুনুল হক তাদের জানান, জীবন এবং জীবিকার প্রয়োজনে তিনি নিজেই জান্নাত আরা

 

ঝর্ণাকে ঢাকার একটি বিউটি পার্লারে কাজ জোগাড় করে দিয়েছেন। এরপর হেফাজতের কয়েকজন শীর্ষ

নেতা তাকে উদ্দেশ্যে করে বলেন, পার্লারে কাজ করা দোষের কিছু না। কিন্তু আপনি (মামুনুল হক) কোন

পরিবারের সন্তান, সেটা আপনার মাথায় রাখা উচিত ছিলো। তাছাড়া ভরণ-পোষণ দেওয়ার ক্ষমতা না

 

থাকলে দ্বিতীয় স্ত্রী গ্রহণ করা উচিত না। ৫ এপ্রিল বৈঠকে উপস্থিত থাকার জন্য হেফাজতের সহকারী

মহাসচিব ফজলুল করিম কাসেমী সংগঠনটির নায়েবে আমির ড. আহমেদ আব্দুল কাদেরকে ফোন দেন।

তাদের ফোনালাপটি পরে ফাঁস হয়ে যায়। এতে হেফাজতের দুই শীর্ষ নেতাকে মামুনুল কাণ্ডে চরম

 

অসন্তোষ প্রকাশ করতে দেখা যায়। এ সময় ড. আহমেদ আব্দুল কাদের বলেন, মানুষ তো সুযোগ পেয়ে

গেলো। সত্য কী মিথ্যা, সেটা পরের কথা, মানুষ তো এখন বলবে- যান, আপনারা মাওলানারা কেমন তা

বোঝা হয়ে গেছে…। আমি বলতে বাধ্য হচ্ছি, আপনারা তাঁকে (মামুনুল হক) এমনভাবে উপস্থাপন

 

করেছেন, যেন তিনি রাজপুত্র। শুধু তাই নয়, মাওলানা ফজলুল করিম কাসেমী ও ফয়সাল আহমেদ নামে

অন্য দুই হেফাজত নেতার ফাঁস হওয়া ফোনালাপ থেকে জানা যায়, মামুনুল হকের হোটেলকাণ্ড

হেফাজতের জন্য বিব্রতকর। তাই আগে হেফাজতের ‘মান’ বাঁচাতে হবে। এজন্য আপাতত সংগঠনের

 

স্বার্থে মামুনুল হককে সাপোর্ট করতে হবে বলে তাঁরা সিদ্ধান্ত নেন। পাশাপাশি মামুনুলকে কিছু অছিহত

করে পরিস্থিতি শান্ত হলে হেফাজতের নেতৃত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়ার বিষয়েও মত দেন তাঁরা। তবে এসব

নেতার কেউ গণমাধ্যমে কথা বলতে রাজি হননি। অডিও ফাঁসের ঘটনায় নিয়েও তাঁরা কৌশলী অবস্থান

 

নিয়েছেন। হেফাজতে ইসলামের কেন্দ্রীয় সূরা কমিটির সদস্য ও সংগঠনটির সাবেক প্রচার সম্পাদক

(চট্টগ্রাম) আ ন ম আহমদ উল্লাহ বাংলাভিশন ডিজিটালকে বলেন, মামুনুল হক যে কাণ্ড করেছেন, প্রকৃত

 

হেফাজতে ইসলাম যদি থাকতো তাহলে এতদিন সে পদে থাকতে পারতো না, বহিষ্কার করা হতো। কিন্তু

দুঃখের বিষয়ে হল, বর্তমান কমিটিতে যাঁরা রয়েছেন তাঁদের মধ্যে মামুনুল-এর সিন্ডিকেট রয়েছে। যে

মামুনুল হক এখনও টিকে আছেন। তবে মামুনুল হক-এর উচিৎ দল থেকে পদত্যাগ করে দলকে

 

সমালোচনার হাত থেকে রক্ষা করা। তিনি বলেন, মামুনুল হকদের কারণে দলের ভাবমূর্তি একেবারেই ক্ষুণ্ণ

হয়েছে। তাঁদের কারণে একটি অরাজনৈতিক ও আধ্যাত্মিক দল রাজনৈতিক ও ব্যক্তি স্বার্থ হাসিলে ব্যবহার

হচ্ছে। এসব বিষয়ে কথা বলার জন্য মামুনুল হককে একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি কল রিসিভ

করেননি।

 

 

Check Also

নিঃস্ব হওয়ার পথে ভারত!

জাতিসংঘের শিশু তহবিল ইউনিসেফ বলছে, ভারতে প্রতি সেকেন্ডে চারজন করে নতুন করো’না রোগী শনা’ক্ত হচ্ছে। …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *