1. tahsanrakibkhan2@gmail.com : admin :
  2. dailymoon24@gmail.com : Fazlay Rabby : Fazlay Rabby
মুক্তিযোদ্ধার জমিতে পুলিশ কর্মকর্তার ১০ তলা বাড়ি - Daily Moon
সোমবার, ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২১, ০৪:২১ অপরাহ্ন

মুক্তিযোদ্ধার জমিতে পুলিশ কর্মকর্তার ১০ তলা বাড়ি

ফজলে রাব্বি
  • Update Time : মঙ্গলবার, ১৪ সেপ্টেম্বর, ২০২১
  • ১১ View

‘সারা জীবনের সঞ্চয়ের সঙ্গে যোগ হয় স্ত্রীর গহনা আর ছেলের মোটরসাইকেল বিক্রির টাকা। শেষ সম্বল দিয়ে রাজধানীর মোহাম্মাদপুরে সাড়ে তিন কাঠার জায়গা কিনি। একতলা টিনশেড বাড়ি নির্মাণ করে মায়ের নামে একটি দাতব্য চিকিৎসালয় গড়ে তুলি। সেই বাড়ি রাতের আঁধারে দখল করে নেন পুলিশ কর্মকর্তা ওবায়দুল হক। আদালতের নির্দেশ অমান্য করে সেখানে

‘আন্দালুসিয়া টাওয়ার’ নামে একটি ১০ তলা আলিশান ভবন নির্মাণ করেছেন। সরকারে সব দপ্তরে চেষ্টা করেও জায়গা ফিরে না পেয়ে দুই বার আত্মহত্যার চেষ্টা করি। সারা জীবনের সঞ্চয় হারিয়ে এই বৃদ্ধ বয়সেও কোভিড ইউনিটে ডিউটি করছি। এই বাড়ি ফিরে না পেলে আমার মরে যাওয়াই ভালো।’ এভাবেই নিজের কষ্টের কথা জবানবন্দিতে উল্লেখ করেছেন মুক্তিযোদ্ধা ডা. এসএম

সিদ্দিকুর রহমান।অভিযুক্ত কর্মকর্তা ট্রাফিক পুলিশের পরিদর্শক (টিআই) ওবায়দুল হকের বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া বিভাগীয় মামলার তদন্তের সময় এ জবানবন্দি দেন ৬৬ বছর বয়সী এই মুক্তিযোদ্ধা চিকিৎসক।ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) করা এই বিভাগীয় মামলায় টিআই ওবায়দুল হকের অপরাধ প্রমাণ হয়েছে। সেই প্রতিবেদনে তার বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করার

সুপারিশ থাকলেও গত ছয় মাসেও তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করেনি পুলিশ।বাড়িটি উদ্ধারে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক), দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক), ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন, পুলিশ সদর দপ্তর ও ডিএমপি কমিশনারের দপ্তরে অভিযোগ করেন মুক্তিযোদ্ধা অধ্যাপক ডা. এসএম সিদ্দিকুর রহমান। সব প্রতিষ্ঠানই নিজেদের মতো করে বিষয়টির তদন্ত করেছে; কিন্তু

কেউই কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারেনি।রাজউকের তৎকালীন পরিচালক উচ্ছেদ অভিযান চালাতে গেলে তাকে লাঞ্ছিত করে তাড়িয়ে দেন পুলিশ কর্মকর্তা ওবায়দুল হক। দুদকের এনফোর্সমেন্ট টিমও অভিযান পরিচালনা করেছে। এতকিছুর পরও ঘটনার সুরাহা না হওয়ায় আদালতের দ্বারস্থ হন ডা. সিদ্দিকুর রহমান। বাড়িটি ফিরে পেতে ঢাকার একটি আদালতে মামলা করেন ওই

মুক্তিযোদ্ধা। আদালত বাড়িটির সব কার্যক্রম মামলা নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত বন্ধ রাখতে নির্দেশ দেন; কিন্তু আদালতের নির্দেশকেও তোয়াক্কা করেননি এই পুলিশ কর্মকর্তা। নিজের ক্ষমতা প্রয়োগ করে আলিশান বাড়িটির নির্মাণকাজ সম্পন্ন করেছেন। এমনকি জালিয়াতির মাধ্যমে বাড়ির ভুয়া হোল্ডিং নম্বর তৈরি করেন মর্মে নথিপত্রে দেখা যায়।সরকারের এসব প্রভাবশালী

প্রতিষ্ঠানের তৎপরতা একটা পর্যায়ে গিয়ে রহস্যজনক কারণে মিইয়ে গেছে। মুক্তিযোদ্ধা ডা. সিদ্দিকুর রহমানের অভিযোগ- শুরুতে সব প্রতিষ্ঠান খুব আগ্রহ নিয়ে সহায়তার হাত বাড়িয়ে দেয়; কিন্তু একটা পর্যায়ে গিয়ে তাদের গতি স্তিমিত হয়ে পড়ে। এখানে কারণ হিসেবে আর্থিক সুবিধা নিতে পারেন তারা- এমন সন্দেহ তার।ডা. সিদ্দিকুর রহমান আমাদের সময়কে বলেন,

১৯৯৫ সালের ২০ এপ্রিল স্ত্রীর গহনা, ছেলের মোটরসাইকেল বিক্রি এবং জীবনের শেষ সম্বল দিয়ে মোহাম্মদপুর হাউজিং সোসাইটি লিমিটেডের ৯ নম্বর রোডের ২০ নম্বর বাড়িটি কিনি। সাড়ে তিন কাঠা জমির মধ্যে আমার নামে দুই কাঠা এবং স্ত্রী ইসরাত জাহানের নামে দেড় কাঠা জমির দলিল করি। এই জমিতে মায়ের নামে একটি দাতব্য হাসপাতল (অজুফা খাতুন

মেমোরিয়াল হাসপাতাল) এবং নিজেদের থাকার জন্য ফ্ল্যাট নির্মাণ করার পরিকল্পনা ছিল। জমিটি কিনেই একতলা টিনশেড ঘর নির্মাণ করে মায়ের নামে একটি দাতব্য চেম্বার গড়ে তুলি। বাড়িটি দেখাশোনার জন্য নুরু নামে এক কেয়ারটেকার নিয়োগ দিই। ২০১৪ সালে রাতের আঁধারে আমার কেয়ারটেকার নুরুর সহযোগিতায় তৎকালীন মোহাম্মাদপুর জোনে কর্মরত টিআই ওবায়দুল

হক ও তার সহযোগী ভূমিদস্যুরা মিলে বাড়িটি দখল করে নেয়। ২০১৪ সালের ৬ সেপ্টেম্বর আদাবর থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করি। আদাবর থানার তৎকালীন ওসি গাজী রুহুল ইমাম ও তেজগাঁও বিভাগের ডিসি বিপ্লব কুমার সরকারকে বিষয়টি জানাই; কিন্তু ওসি ঘুষ হিসেবে টাকা দাবি করলে ডিএমপি কমিশনার ও পুলিশ সদর দপ্তরে লিখিত অভিযোগ করি।পুলিশ সদর

দপ্তরের তদন্তে টিআই ওবায়দুল হকের বিরুদ্ধে আসা অভিযোগের সত্যতা পায়। পুলিশ সদর দপ্তরের নির্দেশে তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা করে ডিএমপি। ওই মামলার তদন্ত শেষে চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে প্রতিবেদন জমা দেওয়া হয়। তাতে ওবায়দুল হকের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের সুপারিশ করা হয়; কিন্তু দীর্ঘ ছয় মাস পার হলেও তার বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা

গ্রহণ করা হয়নি। অভিযোগ ওঠার পর শুধু শাস্তি হিসেবে তাকে চট্টগ্রামে বদলি করা হয়। চট্টগ্রাম শিল্প পুলিশ থেকে বদলি হয়ে ইতোমধ্যে আবার ঢাকায় এসেছেন ওবায়দুল হক। বর্তমানে শিল্প পুলিশের ঢাকার একটি ইউনিটে কর্মরত।বিভাগীয় মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ও ডিএমপির এডিসি নূর আমাদের সময়কে বলেন, ‘তিনি (টিআই ওবায়দুল হক) কাজটি ঠিক করেননি। আমাদের তদন্তে সবকিছু উঠে এসেছে। আমরা প্রতিবেদন জমা দিয়েছি। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।’৬ মাস পার

হলেও কেন ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়নি জানতে চাইলে ডিএমপির প্রফেশনাল স্ট্যান্ডার্ড অ্যান্ড ইন্টারনাল ইনভেস্টিগেশন বিভাগের ডিসি ফরিদা ইয়াসমিন আমাদের সময়কে বলেন, পরিদর্শক থেকে তদূর্ধ্ব কর্মকর্তাদের বিষয়টি দেখভাল করে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ। এ কারণে এ বিষয়টি আমি বলতে পারছি না।ডা. সিদ্দিকুর রহমান কান্নাজড়িত কণ্ঠে আমাদের সময়কে বলেন, নিজের বাড়ি ছাড়া আমার আর কোনো সঞ্চয় নেই। এটি না পেলে আমার বেঁচে থাকার উপায় নেই। নিজের বাড়িতে নিজেই যেতে পারি না।

দখলদাররা প্রাণনাশের হুমকি দিচ্ছেন। পুলিশ এত ভালো কাজ করছে; কিন্তু তার (ওবায়দুল হক) মতো একজন কলঙ্কিত কর্মকর্তা পুলিশের সুনাম নষ্ট করছে। বাড়িটি উদ্ধারে আইজিপি ও প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ কামনা করছি। এ ছাড়া ওবায়দুল হকের শাস্তিও দাবি করেন এই মুক্তিযোদ্ধা।রাজউক ঘটনার প্রাথমিক তদন্তে অভিযোগের সত্যতা পেয়ে উচ্ছেদ অভিযান চালাতে গেলে তৎকালীন পরিচালক (প্রশাসন) ওয়ালিউর রহমানকে লাঞ্ছিত করেন পুলিশ কর্মকর্তা ওবায়দুল হক। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, জাল

কাগজপত্র ও মিথ্যা তথ্য দিয়ে রাজউক থেকে ১০ তলা ভবন নির্মাণের ছাড়পত্র নেন ওবায়দুল হক। পরে প্রাথমিক তদন্তে সত্যতা বেরিয়ে বাড়ি নির্মাণের ছাড়পত্র স্থগিত করে রাজউক; কিন্তু রাজউক স্থগিত করলেও অবৈধভাবে কাজ চালিয়ে যান ওবায়দুল হক।রাজউকের জোন ৩-এর সহকারী অথরাইজড অফিসার রঙ্গন ম-ল আমাদের সময়কে বলেন, আমরা ওই বাড়িটি উদ্ধারের চেষ্টা করেছিলাম। পরে মামলা হয়। মামলা নিষ্পত্তি না হওয়ার কারণে আমরা কিছু করতে পারছি না।সংশ্লিষ্ট নথিপত্রে

দেখা যায়, ২০১৪ সাল পর্যন্ত ওই বাড়ির সব ধরনের ইউটিলিটি বিল পরিশোধ করেছেন সিদ্দিকুর রহমান ও তার স্ত্রী। ২০১৭ সাল পর্যন্ত খাজনা এবং ২০১৬ সাল পর্যন্ত পৌরকর পরিশোধ করেন এই দম্পতি; কিন্তু বাড়িটি দখলের পর জালিয়াতির মাধ্যমে হোল্ডিং নম্বরও পরিবর্তন করে ফেলেন ওবায়দুল হক। ২০ নম্বর বাড়ির পরিবর্তে ১৮/এ নতুন ভুয়া হোল্ডিং নম্বর তৈরি করা হয়। অবশ্য এ বিষয়ে অনুসন্ধান করে রাজউক ১৮/এ এর ভিত্তি খুঁজে না পেয়ে ভুয়া হোল্ডিং নম্বর বাতিল করেন।মোহাম্মাদপুর

হাউজিং সোসাইটি লিমিটেডের আইনজীবী কামরুজ্জামান বলেন, বাড়ির প্রকৃত মালিক ডা. সিদ্দিকুর রহমান। তিনি আমাদের কাছ থেকে প্লটটি ক্রয় করেন। ২০১৪ সালে বাড়িটি ওবায়দুল হক নিজের দাবি করেন; কিন্তু মুক্তিযোদ্ধা তো বাড়িটি বিক্রি করেননি। তা হলে ওবায়দুল হক কীভাবে বাড়ির মালিক হন প্রশ্ন করেন এ আইনজীবী।সরেজমিন দেখা যায়, আলিশান বাড়ি

আন্দালুসিয়া টাওয়ার ঘিরে বসানো হয়েছে সিসি ক্যামেরা। নিরাপত্তায় রাখা হয়েছে বাড়তি লোক। আমাদের উপস্থিতি টের পেয়ে বাড়ি থেকে বেরিয়ে আসেন কয়েকজন।টিআই ওবায়দুল হক চট্টগ্রামে বদলি হয়ে গেলে ভবন নির্মাণের কাজ তদারক করেন তার বন্ধু মো. মোস্তফা কামাল। বেসরকারি একটি টেলিভিশন চ্যানেলের প্রশাসনিক কর্মী মোস্তফা কামাল ভবনের একটি ফ্ল্যাটের মালিকানা পেয়েছেন। আইনি ঝামেলা মোকাবিলায় এভাবে বিভিন্ন পেশার আরও বেশ কয়েকজনকে মালিকানার অংশীদার করেছেন ওবায়দুল হক।অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে টিআই ওবায়দুল হক আমাদের সময়কে বলেন, আমার যা বলার

বিভাগীয় মামলার তদন্তের সময় ঊর্ধ্বতন কর্তকর্তাদের জানিয়েছি। এ নিয়ে আর কোনো কথা বলতে চাই না।দুদক ও ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন অবৈধ দখলমুক্ত করতে অভিযান চালায়। এরই মধ্যে দুদকের এনফোর্সমেন্ট টিম ওই বাড়িতে অভিযান শেষে কমিশনে প্রতিবেদন দাখিল করে। এতে টিআই ওবায়দুল হক অবৈধ ক্ষমতা ব্যবহার করে ওই বাড়িটি দখল করেছে মর্মে তুলে

ধরা হয়। ওই প্রতিবেদনের ভিত্তিতে রাজউক চেয়ারম্যানকে একটি চিঠি দেয় দুদক। তাতে বাড়িটি উদ্ধারে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করে এ বিষয়ে দুদককে অবহিত করতে বলা হয়। এ ছাড়া টিআই ওবায়দুল হকের অবৈধ সম্পদ অর্জনের বিষয়ে অনুসন্ধানের সুপারিশ করা হয়। এর পরই সম্প্রতি দুদকের পক্ষ থেকে পুলিশ কর্মকর্তা ওবায়দুল হকের অবৈধ সম্পদ অর্জনের বিষয়ে

অনুসন্ধান শুরু হয়েছে।দুদক পরিচালক মীর জয়নুল আবেদিন শিবলি আমাদের সময়কে বলেন, মুক্তিযোদ্ধার বাড়ি দখলের বিষয়টি আমরা জানি। তাকে সহায়তার জন্য রাজউক চেয়ারম্যানকে চিঠি দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া ওবায়দুল হকের ক্ষমতার অপব্যবহার করে অবৈধ সম্পদ অর্জনের বিষয়ে অনুসন্ধান করে দেখা হচ্ছে।

Please Share This Post in Your Social Media

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category
© All rights reserved © 2021  dailymoon24.com
Theme Customized BY IT Rony