৩ হাজার মানুষের ৬ ঘণ্টা শ্রম, দাঁড়িয়ে গেল ভাঙা বাঁধ

‘আগামীকাল সকালে দক্ষিণ বেদকাশি ইউনিয়নের চরামুখা এলাকার ভেঙে যাওয়া বাঁধ মেরামত করা হবে’―এমন ঘোষণা দিয়ে রবিবার বিকেল থেকে মাইকিং করা হয়েছিল কয়রা উপজেলার দক্ষিণ বেদকাশি ইউনিয়নে। ক্ষণিকের এই মাইকিংয়েই সাড়া দিয়ে সোমবার (১৮ জুলাই) ভোর থেকেই হাজার হাজার মানুষ জড়ো হয় ভাঙা ওই বাঁধ মেরামতে। ততক্ষণে ভাটার টান পড়েছে কপোতাক্ষ নদে।

মাইক হাতে একজন আহ্বান জানালেন সবাইকে কাজে নেমে পড়ার জন্য।

এর পরই শুরু হলো স্বেচ্ছাশ্রমে দক্ষিণ বেদকাশি এলাকার ভেঙে যাওয়া বাঁধ মেরামতের কাজ। কেউ বস্তায় মাটি ভরছেন আবার কেউ মাটির ওই বস্তা নিয়ে ফেলছেন ভাঙা বাঁধের স্থানে। কেউ বা ব্যস্ত বাঁধ ও খুঁটি পোঁতার কাজে। বসে ছিলেন না নারীরাও। ঘর্মাক্ত, ক্লান্ত মানুষকে পানি খাইয়ে, এটা-ওটা এনে দিয়ে সাহায্য করছিলেন তারাও। এভাবে প্রায় দুপুর ১২টা পর্যন্ত ছয় ঘণ্টা টানা কাজ চলার পর জোয়ারের পানি আসার আগেই বাঁধ মেরামত করে ফেলতে সক্ষম হয় এলাকাবাসী। এই কাজে যুক্ত হয়েছিল প্রায় তিন হাজার মানুষ।

দক্ষিণ বেদকাশির চরামুখা এলাকার ওই বাঁধ ভেঙে গিয়েছিল রবিবার ভোররাতে। এতে পানি উন্নয়ন বোর্ডের ১৪/১ পোল্ডারের বেড়িবাঁধের ৩০০ মিটার নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যায়। নদীভাঙনে ঘরবাড়ি, জমিজমা সব হারিয়ে নিঃস্ব হয়েছে অনেক পরিবার। পানিবন্দি হয়ে পড়ে ওই ইউনিয়নের প্রায় ১০ হাজার মানুষ। বাড়িঘর হারিয়ে ছেলে-মেয়ে ও পরিবারের সদস্যদের নিয়ে অনেকেই খোলা আকাশের নিচে বসবাস করছেন। ভেসে গেছে প্রায় তিন হাজার বিঘা চিংড়িঘের। ডুবে গেছে আমনের বীজতলা। রবিবার ওই বাঁধ মেরামতের চেষ্টা করেও পারেনি এলাকাবাসী। এ কারণে সোমবার অধিক সংখ্যক মানুষকে নিয়ে কাজ শুরু করে তারা।

কয়রা উন্নয়ন সংগ্রাম সমন্বয় কমিটির সভাপতি প্রভাষক বিদেশ রঞ্জন মৃধা বলেন, হাতে হাত, কাঁধে কাঁধ রেখে ভাঙা বাঁধ মেরামতের কাজ বহু আগে থেকেই এই জনপদে চলে আসছে। রাজনৈতিক বা ব্যক্তিগত, যত বড় বিরোধই থাকুক না কেন, এই কাজে কেউ পিছপা হন না। এটা জন্ম থেকে কয়রা এলাকার মানুষের রক্তের সঙ্গে মিশে আছে।

বাঁধ না ভাঙলে পানি উন্নয়ন বোর্ডের ঘুম ভাঙে না উল্লেখ করে দক্ষিণ বেদকাশি এলাকার স্বাধীন সমাজকল্যাণ যুবসংঘের সভাপতি মো. আবু সাঈদ খান বলেন, একবার বাঁধ ভাঙলে কোটি কোটি টাকার উন্নয়ন কর্মকাণ্ড তলিয়ে যায়। অবকাঠামো নাজুক হয়ে পড়ে। বাঁধ ভাঙলে সংস্কার করা হয়, ভাঙার আগে বারবার বলা সত্ত্বেও সংস্কারের কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয় না। দক্ষিণ বেদকাশি ইউনিয়নের অন্তত তিনটি পয়েন্টে বেড়িবাঁধ জরাজীর্ণ হয়ে পড়েছে।

দক্ষিণ বেদকাশি গ্রামের রবিউল ইসলাম বলেন, ‘ভাঙনের কারণে আমার ঘরের ভেতরে পানি ঢুকে পড়েছে। কোথায় থাকব জানি না। রান্না করার কোনো ব্যবস্থা নেই। বাঁধ না হলে ছেলে-মেয়ে নিয়ে কী করব ভেবে পাচ্ছি না। সে কারণে সব কিছু ফেলে স্বেচ্ছাশ্রমে বাঁধ মেরামতের কাজে নেমেছি। ‘

দক্ষিণ বেদকাশি ইউনিয়ন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান মো. আব্দুস সালাম খান বলেন, পানিতে তলিয়ে গেছে দক্ষিণ বেদকাশি ইউনিয়নের পাঁচ গ্রাম। ভেসে গেছে তিন হাজার বিঘা চিংড়িঘের। পানিবন্দি হয়ে পড়েছে ১০ হাজার মানুষ। বাঁধ মেরামতে বস্তা ও বাঁশ-খুঁটি দিয়ে সহায়তা করছে পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো)। বড় কোনো দুর্যোগ এলেই স্বেচ্ছাশ্রমে ঝাঁপিয়ে পড়ে মানুষ। তবে কয়রাবাসীকে বাঁচাতে টেকসই বেড়িবাঁধের কাজ দ্রুত শুরু হওয়ার কোনো বিকল্প নেই বলে জানান তিনি।

পানি উন্নয়ন বোর্ডের উপসহকারী প্রকৌশলী মো. মশিউল আবেদিন বলেন, স্বেচ্ছাশ্রমে মানুষ প্রাথমিকভাবে রিং বাঁধ দিয়ে পানি আটকাতে পেরেছে। পানি উন্নয়ন বোর্ড বস্তা ও বাঁশ দিয়ে সহযোগিতা করেছে। পানি আটকানোর পর মূল ক্লোজারে কাজ করা হবে।

কয়রা উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান এস এম শফিকুল ইসলাম বলেন, ‘নদীভাঙন যেন কয়রার মানুষের পিছু ছাড়ছে না। যখনই কয়রার মানুষ ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করে ঠিক তখনই আবার কোনো না কোনো জায়গায় নদীভাঙন দেখা দেয়। প্রাথমিকভাবে রিং বাঁধ দিয়ে পানি আটকাতে পেরেছি আমরা। উপকূলীয় জনপদ কয়রা উপজেলার মানুষের জানমালের নিরাপত্তায় টেকসই ভেড়িবাঁধ নির্মাণের কাজ যাতে দ্রুত শুরু হয় এ জন্য ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করা হয়েছে। ‘ দ্রুত সময়ের মধ্যে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে বলেও তিনি জানান।

Be the first to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published.


*