আইসিইউ থেকে বের করে দিলো হাসপাতাল; বাবার মৃ’ত্যুর করুণ বর্ণনা

আইসিইউ থেকে বের করে দিলো হাসপাতাল; বাবার মৃ’ত্যুর করুণ বর্ণনা

সম্প্রতি শ্বা’সক’ষ্টে বাবার মৃ’ত্যু নিয়ে হৃদয়বিদারক এক স্ট্যাটাস দিয়েছে চট্টগ্রামের এক ব্যবসায়ী।

সংবাদমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে উঠে আসছে হৃদয়বিদারক সব ঘটনা। স্ট্যাটাসে তিনি

লিখেছেন, বাবাকে নিয়ে বিভিন্ন হাসপাতা’লে ঘুরতে হলো, কেউ তাকে ভর্তি নেয়নি। শেষ পর্যন্ত ঠাঁই

 

হলো চট্টগ্রাম মেডিকেল হাসপাতা’লে। কিন্তু তাকে আর বাঁ’চানো যায়নি।

পাঠকদের জন্য স্ট্যাটাসটি হুবহু তুলে ধ’রা হলো-

বাবার বয়স ৮২ বছর, দীর্ঘদিন ব্রঙ্কাইটিস এবং প্রষ্টেটের সমস্যায় ভুগছেন। ২৭ রমজান সেহরি

শেষ করতে না করতেই বুকে ব্যথা অনুভব করেন সাথে শ্বা’সক’ষ্ট-কাশি, কাশির সাথে হালকা

 

র’ক্ত দেখা যায় এবং প্রচুর ঘামতে থাকেন। বর্তমান পরিস্থিতিতে মেডিকেল এবং প্রাইভেট

হাসপাতা’লের বিমাতা শুলভ আচরণের কথা ভাবতে ভাবতেই ঘণ্টাখানেক কে’টে যায়।

বাবার অবস্থার কোন পরিবর্তন না দেখে কপালে যা থাকে হবে মেনে নিয়ে বাবাকে নিয়ে বেরিয়ে

 

গেলাম এবং দ্রুতগতীতে নগরীর পার্কভিউ হাসপাতা’লের ই’মা’র্জেনসিতে ঢুকলাম। এরমধ্যে ছোট

বোনের হাজব্যান্ড এসে উপস্থিত হলো, কর্তব্যরত ডাক্তার বুকের এক্সরে এবং ইসিজি করালেন,

রিপোর্ট দেখে বললেন বাবাকে দ্রুত আইসিইউতে রাখতে হবে। আমি সময় নষ্ট না করে ব্যবস্থা

 

নিতে বললাম কিন্তু কতৃর্পক্ষ তাদের আইসিইউতে রাখার অ’পারগতা জানালেন কারণ। দু’দিন

আগে নাকি ওনাদের হাসপাতা’লে একজন রোগীর কোভিড পজোটিভ আসে।

সর্বোচ্চ অনুরোধ করার পর জানতে চাইলাম বাবার রিপোর্টে কোভিডের কোনো আশংঙ্কা আছে কিনা?

 

ডাক্তার জানালেন তেমন কোন আশংঙ্কা নেই। বললাম দয়া করে আমাকে এটুকু বলেন যে বাবার

বতর্মান যা অবস্থা তাতে অন্য কোন হাসপাতাল এডমিট করবে কিনা? ওনি জানালেন এডমিট না

করার কোন কারণ নেই, আমি যেন ম্যাক্স অথবা ন্যাশনালে নিয়ে যাই।

 

কালক্ষেপণ না করে ম্যাক্সের দিকে ছুটলাম। ম্যাক্সের ই’মা’র্জেন্সিতে রিপোর্ট দেখালাম। ওনারা বললেন,

আইসিইউ খালি আছে তবে একটু সময় দিতে হবে। ফাইল আইসিইউতে পাঠানো হলো, আমা’র

সামনেই কর্তব্যরত ডাক্তার কয়েকজনকে ফোন করলেন এবং জানালেন আইসিইউ র ডাক্তাররা

 

ছুটিতে আছেন তাই অ্যাডমিট করতে পারবেন না। বুঝলাম রিকোয়েস্ট করেও কাজ হবে না।

সময় নষ্ট না করে ন্যাশনালে ঢুকলাম। ঢুকেই নানা রকমের প্রশ্নের সম্মুক্ষীন হলাম। যেমন- পার্কভিউ

ভর্তি করালো না কেন? ম্যাক্স কি বললো? মা’থা ঠাণ্ডা রেখে উত্তর দিলাম এবং অনুরোধ করে

 

বললাম যে বাবার অবস্থা খুবই খা’রাপ এবং ওনার কোভিডের কোনো সমস্যা নেই। রিপোর্টগুলো

ভালো মতো চেক করে ই’মা’র্জেন্সি ডিপার্টমেন্ট আইসিইউ’তে ফোন করে জানালেন এবং তড়িৎ

ব্যবস্থা নিতে বলে আমাকে ফাইল নিয়ে কাউন্টারে পাঠালেন।

 

এরপর কাউন্টারে কর্ম’রত ব্যক্তি প্রথমে যা বললেন তা হলো, একদিনে কুড়ি হাজার বা তার অধিক

বিল আসতে পারে রাজি আছি কিনা! আমি শুধু বললাম তাড়াতাড়ি করেন প্লিজ। বাবাকে আইসিইউ

’তে ঢুকানো হলো। স্বস্তির নিশ্বা’স ফেলতে না ফেলতেই আইসিইউ থেকে আমা’র ডাক পড়লো,

 

ভেতরে গিয়ে দেখলাম ডাক্তার সাহেব রাগে গজগজ করছেন এবং একজন আরেক জনকে

বলছেন ই’মা’র্জেন্সি ডিপার্টমেন্টের কেমন আক্কল! এই ধরনের রোগীকে আইসিইউতে পাঠালেন!

আর আমাকে উদ্দেশ্য করে বললেন, আপনার বাবার কি সমস্যা আপনি জানেন?

 

বললাম না, তবে মনে হয় কোভিড-১৯ না। উত্তর শুনে ডাক্তার মশাই রেগে গিয়ে বললেন,

আপনি কি ডাক্তার যে বললেন কোভিড না? ওনি খুবই বিপদজনক ওনাকে কোনভাবেই আমাদের

আইসিইউ’তে রাখা যাবে না। দয়া করে ওনাকে এখনি নিয়ে যান। বললাম, ই’মা’র্জেন্সি থেকে যে

বললো আইসিইউতে রাখতে সমস্যা নেই, কোন উত্তর না দিয়ে ডাক্তাররা বেরিয়ে গেলেন।

 

ফাইল নিতে নিতে বাবার দিকে তাকালাম, বাবার নিশ্বা’স নিতে খুব ক’ষ্ট হচ্ছে নিজের

অজান্তেই চোখ ঝাপসা হয়ে আসছিলো। আমা’র এক বন্ধু প্রবালকে (কার্ডিওলজিস্ট, আন্দরকিল্লা

জেনারেল হাসপাতাল) পেলাম এবং বিস্তারিত জানার পর সে বললো কোন প্রাইভেটে ট্রাই না করে

যেন দ্রুত মেডিকেলে চলে যায়।

 

মেডিকেলে গিয়ে দেখি ই’মা’র্জেন্সিতে করো’না উপসর্গ নিয়ে আসা অনেক রোগীর ভিড়, সাধারণ

রোগীসহ সবাইকে এক জায়গায় প্রাই’মা’রী ট্রিটমেন্ট দেওয়া হচ্ছে। এরমাঝে, বাবাকে যতদূর

সম্ভব নিরাপদ দুরত্বে রেখে ফাইল নিয়ে হাজির হলাম।

 

সব শুনে এবং রিপোর্ট দেখে বললেন বুকের এক্সরে আর ইসিজি করাতে হবে। আমি বললাম

স্যার এগুলোতো আমা’র করা আছে। বললেন কবে করিয়েছেন? বললাম এইতো ঘণ্টাখানেক আগে,

কথা শুনে রিপোর্ট গুলো আমা’র দিকে ছুড়ে দিয়ে বললেন, যা বললাম তাই করেন।

 

অনেক ক’ষ্টে একটা হুইল চেয়ারের ব্যবস্থা করে বাবাকে নিয়ে এক্স’রে করাতে ছুটলাম। গিয়ে দেখি

লম্বা লাইন। মেডিকেল স্টাফ, যে কিনা হুইল চেয়ার নিয়ে এসেছে তাকে দিয়ে রিকুয়েস্ট করালাম

যেন বাবাকে একটু আগে দেন, কিন্তু ভিতর থেকে সাফ জানিয়ে দেওয়া হলো সিরিয়াল ভাঙ্গা যাবেনা।

 

এদিকে তীব্র শ্বা’সক’ষ্টের কারণে বাবা বারবার মাস্ক খুলে ফেলছেন, পরে বাবার ক’ষ্ট দেখে আমি

নিজেই বাবার মুখ থেকে মাস্ক খুলে দিই। অনেক ক’ষ্ট করে বাবাকে দাঁড় করিয়ে এক্সরে করালাম,

রিপোর্ট নিয়ে ইসিজি ডিপার্টমেন্টে গেলাম এবং আগের রিপোর্টসহ একসাথে দিলাম। রিপোর্ট দেখে

 

উনি বললেন, টেস্টতো সব করা আছে আবার কেন করালেন? উত্তর না দিয়ে বললাম আমা’র বাবার

কি সমস্যা একটু আমাকে বলবেন? আমাকে জানানো হলো বাবার ফুসফুসে হাওয়া জমে গেছে যা

ইমিডেটলি বুকে ছিদ্র করে পাইপ দিয়ে বের করতে হবে। তাছাড়া বাবার একটা মাইলড এ্যাটাক হয়েছে।

 

এর মধ্যে ঢাকা মেডিকেলের ডাক্তার ভাগনি নিপার সাথে যোগাযোগ করা হলো। সে বললো ফুসফুস

থেকে হাওয়া বের না করলে যেকোন মুহূর্তে দুর্ঘ’টনা হতে পারে। ভাগনি তার পরিচিত ডাক্তারদের তড়িৎ

ব্যবস্থা নিতে বললেন এবং সর্বোচ্চ কেয়ার নিতে বললেন। সার্জারি শেষ হলে বাবাকে মেডিসিন ডিপার্টমেন্টের

এইচডিইউ তে রাখা হলো।

 

পরে ডাক্তাররা আমাকে অভ’য় দিয়ে বললেন, সর্বোচ্চ চেষ্টা তারা করবেন। তবে বাবার অবস্থা

একটু ক্রিটিক্যাল, আর করো’নার কারণে চারপাশের অবস্থা যেহেতু ভিন্ন তাই যাই হোক মেনে

নিতে হবে। রাত ১০ টা পর্যন্ত বাবার অবস্থার কোন পরিবর্তন ঘটেনি।

 

রাত ১১ টার পর থেকে বাবার শরীর আস্তে আস্তে নিস্তেজ হতে থাকে। ডিউটি ডাক্তারকে বিষয়টি

জানালে তিনি রোগী না দেখেই জানতে চাইলেন স্যালাইন চলে কিনা আর অক্সিজেন ঠিক আছে কিনা।

বললাম ঠিক আছে, উনি জানালেন আপাতত এর বাইরে কোন ট্রিটমেন্ট নেই।

 

সারারাত বাবার পাশে বসে রইলাম। বাবার চোখ দুটি হালকা খোলা, বুক ছাড়া বাকি শরীর একেবারে ঠাণ্ডা।

সকাল ৮ টার দিকে অনেকটা জোড় করে একজন ডিউটি ডাক্তারকে রুম থেকে বের করে আনলাম।

ডাক্তার দেখে বললেন অবস্থা ভালো না। ১০ টার দিকে বাবার কাপড় চেইঞ্জ করে বাবাকে পরিষ্কার করে দিই।

 

১০:৪০ এর দিকে শেষবারের মতো বাবা আমা’র দিকে তাকানোর চেষ্টা করেন তখন বাবার গলায় গড়গড়

শব্দ হতে থাকে। ২৮ রমজান, জুম্মাতুল আল’বিদার দিন সকাল ১০:৪৫ মিনিটে বাবা শেষ নিঃশ্বা’স ত্যাগ

করেন। করো’না পরিস্থিতিতে দেশের চিকিৎসা সেবা নিয়ে বেশকিছু দুঃখের কাহিনী ফেসবুকে পড়েছি।

কিন্তু আমাকেও যে কিছু লিখতে হবে স্বপ্নেও ভাবিনি।

 

 

দৃষ্টি আকর্ষণ এই সাইটে সাধারণত আম’রা নিজস্ব কোনো খবর তৈরী করি না..

আম’রা বিভিন্ন নিউজ সাইট থেকে খবরগুলো সংশ্লিষ্ট সূত্রসহ প্রকাশ করে থাকি..তাই কোনো খবর

নিয়ে আ’পত্তি বা অ’ভিযোগ থাকলে সংশ্লিষ্ট নিউজ সাইটের কতৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ করার অনুরোধ রইলো।

Please Share This Post in Your Social Media

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *




© All rights reserved © 2017 NewsTheme
Design BY jobbazarbd.com