এক যে ছিল হীরক রাজা……

এক যে ছিল হীরক রাজা……

আজ ২৯ অক্টোবর, ২০০৬ সালের এই দিনে বাংলাদেশের সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী হয়েছিলেন অদ্ভুত এক

লোক। তাকে বলা হয় এযুগের হীরক রাজা। তিনি হলেন অধ্যাপক ডঃ ইয়াজউদ্দিন আহমেদ। ২০০১ সালের

অক্টোবর মাসে বিএনপি-জামাত জোট ক্ষমতায় আসে।

 

ক্ষমতায় এসে রাষ্ট্রপতি করা হয় অধ্যাপক ডক্টর বদরুদ্দোজা চৌধুরী কে। কিন্তু রাষ্ট্রপতি হিসেবে অধ্যাপক

বদরুদ্দোজা চৌধুরীর আয়ুষ্কাল দীর্ঘস্থায়ী ছিল না। তিনি বিএনপি জামাতের অনুগতভিত্ত রাষ্ট্রপতি হিসেবে,

দায়িত্ব পালন করতে পারেননি।

 

আর এ কারণেই বিএনপি জামাত তাকে সরিয়ে দেয়ার উদ্যোগ গ্রহণ করে । এই উদ্যোগের প্রেক্ষাপটেই অধ্যাপক

বদরুদ্দোজা চৌধুরী পদত্যাগ করেন। বদরুদ্দোজা চৌধুরীর পদত্যাগের পর বিএনপি জামাত জোট এমন একজন

রাষ্ট্রপতি খুজচ্ছিলেন যিনি হবেন,মোসাহেব।

 

যিনি হবেন বেগম জিয়া এবং তারেক জিয়ার কথায় উঠবেন, বসবেন। সে রকম একজন রাষ্ট্রপতি খুঁজে পায়

অবশেষে তারা। তিনি ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ডঃ ইয়াজউদ্দিন আহমেদ। ইয়াজউদ্দিন আহমেদ

রাষ্ট্রপতি হিসেবে শুধুমাত্র বেগম জিয়া এবং তারেকের পদলতি করেননি,

 

বাংলাদেশের গণতান্ত্রিন ইতিহাসে এক কল’ঙ্কিত অধ্যায় রচিত করেছেন। বিএনপি জোট সরকার ক্ষমতায় চিরস্থায়ী

থাকার জন্য তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থাকে কলুষিত করে। তারা সংবিধান সংশোধন করে প্রধান বিচারপতির বয়স

বাড়ান এবং যিনি বিএনপি`র একজন আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক ছিলেন।

 

সেই বিচারপতি কে এম হাসানকে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান করার এক নীলনকশা প্রণয়ন করে। এর প্রতিবাদ

করে আওয়ামী লীগসহ দেশের প্রধান প্রধান রা’জনৈতিক দলগুলো। ২৮ অক্টোবর ছিল বিএনপি-জামায়াত জোটের

ক্ষমতায় থাকার শেষ দিন।

 

ওই দিন খালেদা জিয়ার বিদায় এবং নতুন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের কথা ছিল। কিন্তু সারাদেশেই

গণবিস্ফোরণের মুখে বিচারপতি কে এম হাসান, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দায়িত্ব গ্রহণে অস্বীকৃতি জানান।

এই সময় শুরু হয় একটি সাংবিধানিক প্রক্রি’য়া।

 

এই সাংবিধানিক প্রক্রিয়ায় তৎকালীন সময়ে যে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা ছিল সেটি যদি প্রতিপালিত হতো,

তাহলে মাহমুদুল আমিন চৌধুরি অথবা পরবর্তী প্রধান বিচারপতিকে এই পদের জন্য প্রস্তাব দেয়ার কথা ছিল।

কিন্তু সে সমস্ত প্রক্রি’য়া অনুসরণ না করে ইয়াজউদ্দিন আহমেদ ঘোষণা করেন, তিনি হবেন তত্ত্বাবধায়ক

 

সরকারের প্রধান। ইয়াজউদ্দিন আহমেদ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে অনেকগুলো কৌতুক রয়েছে,

অনেকগুলো গল্প রয়েছে। তবে সবচেয়ে মজার যে কথাটি তার উপদেষ্টাদের কাছ থেকে শ্রুত। তারমধ্যে ছিল যে,

উপদেষ্টামণ্ডলীর বৈঠক ডেকে তিনি ঘুমিয়ে পড়তেন।

 

লুঙ্গি পরেও তিনি উপদেষ্টামণ্ডলীর বৈঠকে এসেছিলেন। এমনকি যখন উপদেষ্টা কমিটির উপদেষ্টারা তাকে অবাধ-

সুষ্ঠু-নিরপেক্ষ নির্বাচন করার জন্য সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ গ্রহণের কথা বলছিলেন তখন তিনি জানিয়েছিলেন যে, আমি

একটু ম্যাডামের সঙ্গে কথা বলেনি।

 

ইয়াজউদ্দিন আহমেদ তত্তাবোধক সরকার প্রধান এবং রাষ্ট্রপতি, দুটি পদ দখল করেছিলেন। কিন্তু এই পদদুটি

আসলে চালাত তৎকালীন তার প্রেস সচিব মোখলেসুর রহমান চৌধুরী । এসময় মোখলেসুর রহমান চৌধুরী ছিল

অঘোষিত তত্বাবধায়ক সরকার প্রধান এবং তিনি যা বলতেন ইয়াজউদ্দিন তাই করতেন।

 

একজন উপদেষ্টা বলেছেন, সে সময় আমরা যখন যে সিদ্ধান্তের জন্য তার দিকে তাকিয়ে থাকতাম, তখন তিনি

সেসময় উঠে চলে যেতেন এবং ফোন করতেন। বলাই বাহুল্য, তিনি খালেদা জিয়া এবং তারেক জিয়ার সাথে

ফোনে কথা বলতেন।

 

কথা বলে তারা যেভাবে নির্দেশিকা দিয়েছিল সেই নির্দেশনা অনুযায়ী কাজ করতেন। এ রকম একটি পরিস্থিতিতে,

বাংলাদেশে একটি অবাধ সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন অসম্ভব হয়ে পড়ে। কিন্তু ইয়াজউদ্দিন গো ধরে থাকেন, তিনি

যেকোনো মূল্যে নির্বাচন করবেন।

 

আর এরকম একটি প্রেক্ষাপটেই ২০০৭ সালের ১১ ই জানুয়ারি সামরিক হস্তক্ষেপের মাধ্যমে ইয়াজউদ্দিনের

তত্ত্বাবধায় সরকারের রাজত্বের অবসান ঘটে। ডঃ ফখরুদ্দীন আহমদের নেতৃত্বে নতুন তত্ত্বাবধায়ক সরকার

গঠিত হয়। এসময় ইয়াজউদ্দিন আহমেদ রাষ্ট্রপতি হিসেবে একজন ঠুঠো জগন্নাথ হয়েই বাকিটা সময় কাটিয়ে

 

ছিলেন। ইয়াজউদ্দিন আহমেদ এর রাজত্বকালে বাংলাদেশ যেন একটি হীরক রাজার দেশে পরিণত হয়েছিল।

তিনি যা বলতেন এবং যা করতেন তা সকলের কাছে একটা হাস্যকর কৌতুকের বিষয়ে পরিণত হয়েছিল

রাষ্ট্রযন্ত্রের সর্বোচ্চ ব্যক্তির এরকম ভা’ড়ামো।

 

তবে বিএনপি নিজেকে র’ক্ষা করার জন্য এবং ক্ষমতায় থাকার জন্য ইয়াজউদ্দিনকে রাষ্ট্রপতি হিসেবে বেছে

নিয়েছিলে। তাকে রাষ্ট্রপতি হিসেবেও দায়িত্ব দিয়ে ছিলেন। সেই ইয়াজউদ্দিনই সবচেয়ে বড় বিশ্বাস ঘাতকতা

করেছিল বিএনপি-জামায়াতের সঙ্গে। তার কারণ, যখন ফখরুদ্দিনের তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠিত হয় তখন

 

ভীতু এই হিরক রাজা কোন প্রতিবাদ করেননি। বরং বঙ্গভবনের আরামদায়ক জীবন যাপনের জন্যই তিনি সব কিছু

মেনে নিয়েছিলেন নীরবে। বাংলাদেশের রাজনীতে এরকম একটি কৌতুকময় চরিত্র ভবিষতে আর আসবে কিনা তা

কেউ জানে না। তবে এরকম একটি চরিত্র সরকারের সর্বোচ্চ পদ গ্রহণ করুক সেটি সম্ভবত কেউ চায় না।

 

 

Please Share This Post in Your Social Media

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *




© All rights reserved © 2017 NewsTheme
Design BY jobbazarbd.com