চেয়ারম্যানের বিলাসিতায় এক ইউনিয়নে ৩৭ ব্রিজ!

হাটে ব্রিজ, মাঠে ব্রিজ, খালে ব্রিজ এমনকি সড়কেও ব্রিজ। কারণে অকারণে নিজ এলাকায় ৩৭টি ব্রিজ নি’র্মাণ ক’রেছেন তিনি। কোটি কোটি টাকার এসব অ’প্রয়োজনীয় ব্রিজে’র অর্থায়ন হয়েছে সরকারি টাকায়। বগুড়ার ধুনট

 

উপজে’লার গোপা’লনগর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আনোয়ারুল ই’স’লা’ম এসব ব্রিজ নি’র্মাণ করে পরিচিতি পেয়েছেন ‘ব্রিজ চেয়ারম্যান’ হিসেবে। স্থা’নীয় লোকজনের স’ঙ্গে কথা বলে জা’না গেছে, নিজ এলাকায় ব্রিজ ও

 

কালভা’র্ট নি’র্মাণ করাই ছিল আনোয়ারুল ই’স’লা’মের নে’শা। আর এই নে’শা থেকেই তিনি তার নিজ ইউনিয়নে নি’র্মাণ করে নিয়েছেন ৩৭টি ব্রিজ ও কালভা’র্ট।তবে সরকারের এলজিইডি অধিদফতরের অর্থায়নে একের পর এক এসব অ’প্রয়োজনীয় স্থাপনা নি’র্মাণ হলেও এই দফতরের পক্ষ থেকে কখনো এগুলোর সম্ভাব্যতা যাচাই করে দেখা

 

হয়নি। এলাকাবাসী বলেছেন, নির্বাচনী প্র’তিশ্রুতি এবং নিজে’র প্র’ভাব জাহির ক’রতে তার এলাকায় এখন ব্রিজে’র ছড়াছড়ি। বদ্ধ পুকুর থেকে শুরু করে খেলার মাঠ ও জমি কোনো স্থানই এড়িয়ে যায়নি চেয়ারম্যানের

 

দৃষ্টিঅ’প্রয়োজনীয় এসব ব্রিজ ও কালভা’র্ট নিয়ে বিড়ম্বনাও কম নয়। অনেক স্থানে দেখা গেছে সদ্য নির্মিত কালভা’র্ট ব’ন্ধ করে বাড়ি নি’র্মাণ করা হয়েছে। কোনো স্থানের ব্রিজ ব্যবহারই হয় না। এলাকাবাসী ইউপি চেয়ারম্যানের এই

 

ব্রিজ বিলাসের পেছনে তার বড়ভাই আতাউর রহমানের অবদানের কথা বলেছেন। সরকারের প্র’ভাবশালী আমলা হওয়ার কারণে মূলত তার সুপারিশেই একের পর এক এসব ব্রিজ ও কালভা’র্ট নি’র্মাণে কখনো কারপন্ন করেনি এলজিইডি অধিদফতর।

 

ধুনট উপজে’লার গোপা’লনগর ইউনিয়নটি মাত্র ১৩ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের এবং ২৭টি গ্রাম নিয়ে গঠিত। এই ইউনিয়নের প্রায় প্রতিটি গ্রামেই রয়েছে ব্রিজ। তবে চেয়ারম্যান আনোয়ারুল ই’স’লা’মের নিজে’র গ্রাম

 

সাতটিকুরিতে ব্রিজে’র পরিমাণ একটু বেশি। এই গ্রামেই একটি ম’স’জিদের সামনে নি’র্মাণ করা হয়েছে ৪০ মিটার দীর্ঘ একটি লম্বা ব্রিজ। এটি নি’র্মাণে এলজিইডির ব্যয় হয় কোটি টাকা। এলাকায় গিয়ে স্থা’নীয় লোকজনের সাথে

 

কথা বলে জা’না গেছে অনেক তথ্য।গ্রামের মুজাহিদ নামের এক যুবক বলেন, ‘এটি আর কী দেকপেন। হামাকেরে গোটাল গাওত’ইতো বিরিজ আছে। অল্পিএনা ঘুরলেই দেকপেন। এমন অনেক জাগা আছে যেটি মানুষজন যায়ই না, কিন্তু সেটিও বিরিজ করিছে চেয়ারম্যান।’

 

ম’স’জিদের সামনে ব্রিজ নিয়ে কথা হয় আবুল প্রমাণিক নামের আরও একজনের সাথে। তিনি জা’নালেন, তাদের ব্রিজে’র নিচ দিয়ে পানি প্রবাহের কোনো ব্যব’স্থা নেই। দুইপাশে ঘরবাড়ি ঝোপঝাড়ের আড়ালে জায়গাটি এখন

 

একটি নিচু গর্ত মাত্র। মাটি কে’টে উঁচু করলেই এই স্থানটি চলাচলের উপযোগী করা যেত। কিন্তু সেখানে করা হয়েছে লম্বা ব্রিজ। অ’প্রয়োজনীয় ব্রিজ নি’র্মাণের ক্ষেত্রে আরো একটি বড় উদাহ’র’ণ হলো বিশাড়দিয়াড়। এই ব্রিজটি যে স্থানে নি’র্মাণ করা হয়েছে সেটি আজগর আলী নামের এক ব্য’ক্তির জমি। এই স্থানে ছোট একটি গর্ত তৈরি হওয়ায়

 

তিনি সেখানে মাছের চাষ করেন। জমির মালিক আজগর আলীর ভাতিজা মোহাম্ম’দ আলী জা’নান, তার চাচা জমিটি রাস্তার জন্য দান ক’রেছেন। কিন্তু চেয়ারম্যানের নির্দে’শে ওই স্থানে রাস্তা না করে সেতু করা হয়েছে। এই সেতু দিয়ে সারাদিন একশ জন লোকও চলাচল করে না।স্থা’নীয় এলজিইডি বিভাগ জা’নায়, এই সেতু নি’র্মাণ প্রকল্প

 

ঢাকা থেকে পাস করা হয়। এরপর টেন্ডার আ’হ্বান করে কাজ শুরু করা হলেও দুর্গম এলাকা হওয়ায় ঠিকাদার সেখানে কাজ করেনি। পরে সেখানে দ্বিতীয় দ’ফায় আবার টেন্ডার আ’হ্বান করে কাজ করা হয়। এরই মাঝে ৬৫ মিটার দৈর্ঘ্য এবং ৩.৫ মিটার প্রস্তের ব্রিজটির ব্যয় ১১ লাখ থেকে বৃ’দ্ধি পেয়ে দাঁড়ায় ৫০ লাখ টাকায়।

 

 

সরেজমিন পরিদ’র্শনে দেখা গেছে, বিশাড়দিয়াড় ব্রিজে’র চারপাশে উঁচু জমি। ব্রিজটিতে যাওয়ার জন্য কোনো সংযোগ সড়ক নেই। কোনো রকম যানবাহন চলাচলের উপযোগী নয়, এরকম একটি তীরের মতো বাঁকানো সড়ক দিয়ে পায়ে হাঁটলে ব্রিজে পৌঁছানো যাবে। চারপাশে জঙ্গল আর ঝোঁপঝাড়ে ঢাকা জায়গাটিতে এমনিতেই মানুষ চলাচল অনেক কম।

 

 

সেতুর সামনেই রয়েছে আবু বক্কর নামের একটি ব্য’ক্তির বাড়ি। তিনি জা’নালেন, ওই স্থানে মাটি ভরাট করে রাস্তা নি’র্মাণের কথা ছিলো। এখন ব্রিজ হওয়ার কারণে তার বাড়িটিই সামনে প’ড়েছে। তবে তিনি চলাচলের সুবিধার্থে বাড়ির জায়গা ছাড়বেন না। প্রয়োজনে ওখানে বাঁকা সড়ক হলেও তাতে তার করার কিছুই নেই।

 

 

গোপা’লনগর ইউনিয়নে বেশ কয়েকদিন ঘুরে এলাকার বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের সাথে কথা বললে তারা এটাকে চেয়ারম্যানের ব্রিজ বিলাস বলে আখ্যায়িত করেন। তাদের মতে গ্রামের অনেক স’মস্যা বাদ দিয়ে চেয়ারম্যান সাহেব ব্রিজ করার দিকে মনোযোগী হয়েছেন।

 

এ ব্যাপারে এলজিইডি অধিদফতরে খোঁজ নিলেও কেউ প্র’কাশ্যে মুখ খুলতে চায়নি। তবে নাম প্র’কাশ না করার শর্তে একজন ক’র্মক’র্তা জা’নালেন ভেতরের কথা। তিনি বলেন, ‘ভাই আম’রা নিজে’রাও জানি না কোন স্থানে কত বড় ব্রিজ হবে। একযুগ আগে যিনি এলজিইডির প্রধান প্রকৌশলী ছিলেন তিনি এখন অবসরে। মূলত প্রধান

 

প্রকৌশলীর অফিস থেকেই সরাসরি বেশির ভাগ কাজে’র নির্দে’শনা এসেছে। আম’রা নির্দে’শনা বাস্তবায়ন করেছি মাত্র। এ কারণে অনেক স্থানেই অ’প্রয়োজনীয় ব্রিজ হয়েছে। আর এখন এই ব্রিজগুলো এলজিইডি বিভাগের জন্য গলার কাঁ’টা হয়ে দেখা দিয়েছে।’

 

উদাহ’র’ণ হিসেবে তিনি জা’নান, চেয়ারম্যানের বাড়ির পাশে একটি ম’স’জিদের সামনে ব্রিজ করার জন্য নির্দে’শনা আসে। সেখানে ৫০ মিটার ব্রিজ ক’রতে গিয়ে দেখা যায় জায়গাটিতে ৪০ মিটার গ্যাপ রয়েছে। পরে অনুমোদিত অংশ থেকে ১০ মিটার বাদ দিয়ে কে’টে ব্রিজ কমিয়ে ফেলা হয়। এভাবেই কাজ হয়েছে প্রায় প্রতিটির।

 

তবে এলজিইডি অধিদফতর ধুনট উপজে’লার সাবেক প্রকৌশলী আব্দুর রশিদ জা’নান, আম’রা মূলত যে স্থানে পানি প্রবাহ আছে, রাস্তা থাকায় জনচলাচল বি’ঘ্ন িত হতে পারে এমন স্থান চি’হ্নিত করে সেখানেই ব্রিজ করে থাকি। এক্ষেত্রে এখানে যা হয়েছে সেটা আমি এখন এসে দেখছি।

 

গোপা’লনগর গ্রামের বাসিন্দা ইউপি চেয়ারম্যান আনোয়ারুল ই’স’লা’মের বড় ভাই আতাউর রহমানের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি জা’নান, আমি উন্নয়ন কাজে সহায়তা কিছু করেছি এটা ঠিক। তবে কোনটা অ’প্রয়োজনীয় এবং কোনটা প্রয়োজনীয় সেটা নির্ধারণ করার দায়িত্ব সংশ্লি’ষ্ট বিভাগের।

 

আ’লো’চি’ত আনোয়ারুল ই’স’লা’ম পরপর ৩ বার চেয়ারম্যান থাকার পর গত নির্বাচনে ভোটে হেরেছেন। এখন তিনি জমিজমা দেখাশুনা করেন।গোপা’লনগর ইউনিয়নের সেই সাবেক চেয়ারম্যান আনোয়ারুল দা’বি করেন, তার এলাকায় নি’র্মাণ করা কোনো ব্রিজই অ’প্রয়োজনীয় নয়। তিনি প্রয়োজনের তাগিদেই এসব স্থানে সেতু নি’র্মাণের জন্য সংশ্লি’ষ্ট বিভাগের কাছে অনুরো’ধ জা’নিয়েছিলেন।

 

প্রয়োজনীয় হলে এখন এগুলো অ’প্রয়োজনীয় ও পরিত্যক্ত অব’স্থায় প’ড়ে রয়েছে কেন? এমন প্রশ্নের জবাবে আনোয়ারুল ই’স’লা’ম জা’নান, এলজিইডি অনেক ব্রিজ ও কালভা’র্টের সংযোগ সড়ক করে দেয়নি। এ কারণে মানুষ এখন ভোগান্তিতে পড়ছে। আর এখন মনে হচ্ছে সেগুলো অ’প্রয়োজনীয়।সুত্রঃ জাগো নিউজ

 

 

Check Also

১১ হাজার টাকা ঘু’ষ দাবি চা-নাস্তা খেতে!

নানা অ’নিয়’ম ও দু’র্নী’তির অ’ভিযো’গ উঠেছে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগর উপজেলার (হাওর অঞ্চলের অবকাঠমো ও জীবনমান উন্নয়ন …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *